Moynagarh Rajbari Tour

Facebook group bangalir berono

Samiran Chandra Banik

From Facebook group

ভাবতে পারেন-
১) এটা এমন একটা রাজবাড়ি যেটা আমাদের বাংলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপের মধ্যে অবস্থিত। যেখানে যেতে গেলে নৌকো ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
২) এই ময়নাগড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মমঙ্গল কাব্যের নায়ক লাউসেনের নাম।
৩) এই রাজবাড়ীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের নাম।
৪) বাংলা ছবির স্বনামধন্য অভিনেতা ছবি বিশ্বাস বেশ কয়েকবার এই রাজবাড়ীর আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন।
৫)তাছাড়া রাজবাড়ি বলতে আমরা যেটা বুঝি, কিছু একটা দোতলা বাড়ি। এখানে সেসব কিছুই নেই। একটা সাদামাটা একতলা বাড়ি। বাড়ির আসল সৌন্দর্য বাড়ির ভেতরে। বাড়ির ভেতরে না ঢুকলে বোঝা যাবে না যে কি রহস্য লুকিয়ে আছে এই বাড়ির অভ্যন্তরে।

কথায় আছে,

ময়না রাজার মান
গজনা রাজার ধান
কুচল ঘোড়াইয়ের পাকা
দে নন্দের টাকা।।

ইতিহাস, মঙ্গলকাব্য আর কিংবদন্তির সাথে জড়িয়ে আছে এই ময়নাগড় আর ময়নাগড় রাজবাড়ী। যাকে ঘিরে রয়েছে অনেক রহস্য রোমাঞ্চ ও লোক কাহিনী।
ময়নাগড় হলো ময়না ব্লকের গড়সাফাৎ মৌজায় অবস্থিত জলবেষ্টিত একটি ভূখন্ড। ময়নাগড়ের আরেক নাম ময়না চৌড়া। চৌড়া শব্দের অর্থ জলবেষ্টিত দ্বীপ। শোনা যায় বাহুবলীন্দ্র রাজারা সমুদ্রের তীর থেকে জেগে ওঠা ১০৫ টি গ্রাম নিয়ে ময়না পরগণার প্রবর্তন করেন।
কলকাতা থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে পূর্ব মেদিনীপুরে অবস্থিত এই ময়নাগড়। কোলাঘাট থেকে কুড়ি কিলোমিটার গিয়ে নিমতৌড়ি মোড় থেকে ডানদিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে সেই রাস্তা ধরে সোজা চলে যাওয়া যায় ময়না গড়ে।
ভৌগোলিক বিশেষজ্ঞদের অনুমান কি কেলেঘাই নদীর মোহনায় জেগে ওঠা চরভূমি হলো এই ময়নাগড়। যা পূর্বতন ময়না চৌড়া নামে খ্যাত। চৌড়া শব্দের অর্থ হল জলবেষ্টিত দ্বীপ।
কারো কারো মতে ধর্মমঙ্গল কাব্যের নায়ক লাউসেনের রাজধানী ছিল এই ময়নাগড়। সে সময় কালিদহ ও মাকড়দহ নামে দুটি পরিখার সাহায্যে ময়নাগড় সুরক্ষিত ছিল।
আবার লাউসেনের সাথে কিন্তু ইতিহাসেরও যোগ আছে। গৌড়েশ্বর ধর্মপালের সেনাপতি কর্ণ সেনের পুত্র হলেন এই লাউসেন। এই লাউসেনই ধর্ম ঠাকুরের কৃপায় পশ্চিমঘাটে সূর্যোদয় দেখিয়েছিলেন।
আবার কারো মতে দ্বিতীয় মহীপাল এই ময়নাগড়ের প্রতিষ্ঠাতা। তবে এই মত অনেকেই মানতে চান না। যাইহোক ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক আছে এবং থাকবেই।
লাউসেনের পর এই ময়নাগড় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীকালে জলদস্যু শ্রীধর হুই এই ময়নাগড়ের দখল নেয়। জলদস্যু শ্রীধর হুই এরপর বিভিন্ন এলাকায় লুটতরাজ শুরু করে। তাকে সাহায্য করত পর্তুগিজ ও মগেরা। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল বিভিন্ন এলাকার মানুষজন।
সেই সময় ময়নাগড় ছিল উড়িষ্যা রাজ্যের অন্তর্গত। সমস্ত উড়িষ্যায় ৩১ টি দণ্ড পাটের মধ্যে অন্যতম ছিল জলৌতি দন্ড পাট। এই ময়নাগড় ছিল জলৌতি দণ্ডপাটের অন্তর্ভুক্ত। জলৌতি দণ্ড পাটের সদর দপ্তর ছিল বালিসিতা অঞ্চল।
উৎকল রাজ কপিলেন্দ্র দেব এর আমলে তার অধীনস্থ সেনা নায়ক কালিন্দীরাম সামন্তকে ১৪৩৪ সালে জলৌতি দণ্ডপাটের শাসনকর্তা করে কেলেঘাই নদীর তীরে বালিসিতা অঞ্চলে পাঠিয়ে দেন । তিনিই বর্তমান ময়নাগড় রাজবংশের আদিপুরুষ। তারই পঞ্চম পুরুষ উৎকল রাজার নির্দেশে গোবর্ধন সামন্ত শ্রীধর হুইকে হটিয়ে ময়নাগড় দখল করেন।


পরবর্তীকালে ১৫৫৯ সালে উৎকলের সিংহাসনে বসেন মুকুন্দ হরিচন্দন।
উড়িষ্যার রাজপাট পরিবর্তনের ফলে গোবর্ধন সামন্ত এই মুকুন্দ হরিচন্দনকে কর দেওয়া বন্ধ করে দেন। তখনকার সময়ে সামন্ত রাজাদের উৎকলের রাজাকে কর দেওয়াই ছিল প্রচলিত রীতি। এর পরিণামে উৎকল রাজা গোবর্ধন সামন্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং গোবর্ধন সামন্তকে যুদ্ধে পরাজিত করে বন্দী করেন। উড়িষ্যার রাজপ্রাসাদের কাছেই ছিল বন্দিশালা। সেখানেই বন্দি ছিলেন গোবর্ধনান্দ এবং তার স্ত্রী। বন্দিশালায় গোবর্ধনানন্দ ও তার স্ত্রী প্রতিদিন সংগীত চর্চা করতেন । তারা প্রত্যহ শেষ রাত্রে ভজন গান গাইতেন। প্রতিদিন শেষ রাত্রে সুললিত কন্ঠের ভজন গান শুনে রাজা কৌতুহলী হন যে,কারা এই গান গাইছেন। খবর নিয়ে জানতে পারেন বন্দি গোবর্ধন সামন্ত এই গান গেয়ে থাকেন। তিনি খুব খুশি হন তার গান শুনে। উৎকল রাজা গোবর্ধন সামন্তকে সসম্মানে মুক্তি দেন। তিনি জানতেন গোবর্ধন সামন্ত সৌম্য কান্তের অধিকারী, প্রচন্ড সাহসী, বীরপুরুষ, মল্লযুদ্ধ ও অস্ত্র চালনায় পারদর্শী। তিনি চিন্তা করলেন ভবিষ্যতে উৎখল রাজ্যের দুর্দিনে তার মত রনণিপুন ও দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন মানুষের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। তাই তাকে শুধু মুক্তি নয়, তাকে সিংহাসন রাজচ্ছত্র, চামর,বাণ,ডংকা যজ্ঞোপবীত এবং রাজা আনন্দ ও বাহুবলীন্দ্র উপাধিতে ভূষিত করেন। বাহুবলীন্দ্র শব্দের অর্থ, ইন্দ্রের ন্যায় বাহু বলশালী।
তার সঙ্গীতে মুগ্ধ হয়ে উৎকল রাজ তাকে নানা উপাধিতে ভূষিত করেন এবং নানা জিনিস উপহার দেন। তার নাম হয় গোবর্ধনানন্দ বাহুবলীন্দ্র। সেটা সম্ভবত ১৫৬১ সাল হবে। রাজা গোবর্ধনানন্দ এই ভাবে বাহুবলীন্দ্র রাজ পরিবার প্রতিষ্ঠা করেন।
সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই বংশের বংশধররা বাহুবলীন্দ্র পদবী ব্যবহার করে আসছেন।
গোবর্ধনানন্দ বাহুবলীন্দ্র ( ১৫৬১ – ১৬০৭,) রাজাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জলদস্যু শ্রীধর হুইকে হটিয়ে ময়নাগড় দখল করেন। যে ঘটনার কথা আগেই উল্লেখ করেছি।


তিনি ময়নাগড়ের চতুর্দিকে আরো একটি গভীর পরিখা তৈরি করে ময়নাগড়কে দুর্ভেদ্য করে গড়ে তোলেন। ময়নাগড়ের চারি দিকে তিনটি পরিখা ছিল। ময়নাগড় বেষ্টিত তিনটি পরিখার প্রথমটির নাম কালিদহ, যেটা এখনো বর্তমান। নৌকো করে এই কালিদহ পেরিয়েই ময়নাগড়ে যেতে হয়। এই ময়নাগড়ে বর্তমানে রাজ পরিবারের বংশধররাই বসবাস করেন। তাদের নিজস্ব ঘাট ও নৌকো আছে। নৌকো করেই তারা মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। এই কালিদহের চওড়া প্রায় ১৭০ ফুট। এরপরের পরিখার নাম ছিল মাকড়দহ । পরবর্তীকালে ময়না খড়গপুর উড়ালপুলের জন্য মাকড়দহ পরিখাটি অনেকটাই বুজে যায়। তবে তার অংশ বিশেষ এখনো বর্তমান। তৃতীয় পরিখাটি বহুদিন আগেই বুজে গেছে।
সাধারণ মানুষজন মূল ভূখণ্ড থেকে সকাল বেলা ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত নৌকা করে এই ময়নাগড়ে আসতে পারেন। তারপর সাধারণ মানুষের এপারে আসা বন্ধ হয়ে যায়। রাতের বেলা রাজ পরিবারের লোকজন ছাড়া অন্য কেউ এই ময়নাগড়ে থাকতে পারে না। ময়নাগড়ে বসবাসকারী রাজ পরিবারের সদস্যদের কোন প্রয়োজনে নৌকো করে এ পারে আসতে হয়। কারণ ওখানে কোন দোকানপাট নেই। এমন কি কেউ মারা গেলে তার মৃতদেহও নৌকো করে এপারে নিয়ে এসে, নির্দিষ্ট জায়গায় দাহকার্য সম্পন্ন করা হয়।
ফিরে যাই আগের কথায়। ময়নাগড়ের বাইরের দিকে পরিখার ধার ঘেঁষে কাঁটা বাঁশের ঝোপ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল। যাতে কারো ছোঁড়া তীর বা গোলাগুলি এপারে আসতে না পারে। এখনো ময়নাগড়ে সেই কাঁটা বাঁশের ঝোপঝাড় দেখা যায়। আর মাঝে মাঝে ছিল মাটি দিয়ে উঁচু করা ঢিবির মতন যাকে বলে দমদমা। তার উপরে ২৪ ঘন্টা বসানো থাকতো কামান। পরিখাতে ছাড়া থাকতো অনেকগুলি কুমির। ফলে বাইরের লোকের লোকের পক্ষে ওই পরীক্ষা পেরিয়ে ময়নাগড়ে আসা দুষ্কর ছিল। এছাড়াও কেউ যদি রাজার বিরুদ্ধে বিরুদ্ধ মত পোষণ করতো, তাকে ঐ পরিখার জলে ফেলে দেওয়া হতো। জলে বাস করা কুমিররা তাকে খেয়ে ফেলতো। এইভাবে ময়নাগড়কে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীতে পরিবৃত করে বালিসিতা গড় থেকে ময়নাগড়ে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন, ১৫৬১ সালে । এখানে বলে রাখা ভালো ১৯৪৪ সালে কংসাবতীর বন্যায় বালিসিতা গড় পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়। রাজা গোবর্ধনান্দের যে বিরাট সৈন্যবাহিনী ছিল, তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল মুসলমান সম্প্রদায় ভুক্ত। সেই কারণেই এই ময়নাগড়ের পরিখা কালিদহের উত্তরে পীর হজরত তুর জালাল শাহের দরগা দেখতে পাওয়া যায়।
মুক্তি পাওয়ার পর গোবর্ধনানন্দ বাহুবলীন্দ্র পৌষী পূর্ণিমায় রাজ সিংহাসনে অভিষিক্ত হন। তারপর থেকে প্রতিবছর পৌষি পূর্ণিমায় মহাসমারোহে অভিষেক ক্রিয়া সম্পন্ন হতো। ১৯৩৮ সালে নারায়ণানন্দ বাহুবলীন্দ্রের সময় থেকে কুলদেবতা শ্রী শ্রী শ্যামসুন্দর জিউর পাদপদ্মে এই অভিষেক প্রক্রিয়া সমর্পিত হয়। সেই থেকে প্রতি বছর পৌষি পূর্ণিমায় শ্রী শ্যামসুন্দর জিউর অভিষেক প্রক্রিয়া উপলক্ষে বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ময়নাগড়ে রয়েছে শ্রী শ্রী শ্যামসুন্দর জিউর মন্দির । যেটি পঞ্চদশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত বলে কথিত আছে। যে মন্দিরে শ্রী শ্রী শ্যামসুন্দর জিউর নিত্য পূজা হয়। তাছাড়া শ্রী শ্রী শ্যামসুন্দর জিউর রাসযাত্রা খুব বিখ্যাত। শ্রী শ্রী শ্যামসুন্দর জিউকে রাজ বেশে সাজিয়ে নৈশ কালে নৌকা বিহার করানো হয় পরিখার জলে। রাসযাত্রার সময় সেই নৈশ কালীন নৌকো বিহার দেখার জন্য বহুদূরান্ত থেকে লোক এসে ভিড় জমান। এই রাসযাত্রা প্রায় সাড়ে চারশো বছরের পুরনো। সেই উপলক্ষে ১৫ দিনব্যাপী মেলা বসে পরিখার বাইরের দিকে ফাঁকা জায়গায়।
তিনটি পরিখার ধার দিয়ে সারি সারি নারকেল আর তালগাছ লাগানো হয়েছিল। যার বেশকিছু নারকেল গাছ এখনো বর্তমান। সারি সারি নারকেল গাছ লাগানোর ফলে এটা দেখতে অনেকটা কেরালার ব্যাকওয়াটারের মতন ছিল। তাই পরিখাতে নৌকো ভ্রমন ছিল একটা আলাদা রোমাঞ্চকর বিষয় । এখনো নৌকো করে ঘুরলে সেই অনুভূতিটা জাগে। পরিখাতে নৌকো ভ্রমণের সময় আমরাও সেই অনুভূতিটার স্বাদ পেলাম। মনে হয় এই সারি সারি তালগাছগুলি এখনো অতন্দ্র প্রহরীর মতন দাঁড়িয়ে আছে। শুনলাম জোছনা রাতে নৌকো ভ্রমণ নাকি আরো বেশি আকর্ষণীয়।
এই রাজ পরিবারের বিশেষ কিছু নিয়ম ছিল একসময়। যে সমস্ত মেয়েরা এই রাজ পরিবারের রাজবধূ হয়ে আসতেন। তাদেরকে পালকি শুদ্ধ কালিদহের জলে ডুবিয়ে শুদ্ধ করে তবেই তাদের ময়নাগড়ে প্রবেশ করানো হতো । তারপর তাদের বরাবরের জন্য ঠাই হতো অন্দরমহলে। বাইরের মহলে আসার তাদের কোন আর অধিকার ছিল না।
যে সমস্ত রাজবধূ বিধবা হতেন তাদেরকে স্বপাক এক বেলা আহার করতে হতো। এবং তাদেরকে যে কাঠের চুলায় রান্না করার ব্যবস্থা থাকতো, সেই চুলায় রান্নার জন্য ভিজে কাঠ দেওয়া হতো, কালিদহের জলে ডুবিয়ে। যাতে তারা সারাদিন রান্না আর নিজের খাওয়া দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারেন। অন্য কোন দিকে মনোযোগ দিতে না পারেন।
রাজা গোবর্ধনান্দের পর ১০ পুরুষ প্রবল প্রতাপে ময়নাগড়ে রাজত্ব করেছিলেন। রাজা গোবর্ধনানন্দের মৃত্যুর পর তার পুত্র পরমানন্দ রাজা হন। তিনি পরমানন্দপুর নামে একটি গ্রাম পত্তন করেন। তিনি সেই গ্রামে শ্রীকৃষ্ণ রায় জিউর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের নিত্য পূজার জন্য প্রচুর পরিমাণ জমি দেবোত্তর করে দেন। দিল্লির সম্রাট জাহাঙ্গীর পরমানন্দকে বাদশা জাহাঙ্গীর এর প্রতীক হিসেবে পাঞ্জা প্রদান করেন ।
আর পুত্র মাধবানন্দের রাজত্বকালে বাংলা শায়েস্তা খালের অধীনে চলে যায়।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের সময় জগদানন্দ ময়না রাজা ছিলেন। জগদানন্দের রাজত্বকালে (১৭৭০ সাল থেকে ১৭৭৩ সাল ) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাপতি রবার্ট বেইলী এক বিরাট বাহিনী নিয়ে ময়নাগড় আক্রমণ করেন। রাজা জগদানন্দ বেশ কিছু বিশ্বস্ত অনুচরদের নিয়ে একটা সুড়ঙ্গ দিয়ে রাজপ্রাসাদের গোপন কুঠুরিতে আশ্রয় নেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদের ব্যাপক তল্লাশিতেও রাজা জগদানন্দ কে তারা ধরতে পারিনি। তারপর থেকে রাজা জগদানন্দের বা তার অনুচরদের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। তারা কি সবাই পালিয়ে গিয়েছিলেন, নাকি এই রাজ প্রাসাদের গোপন কুঠুরিতেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন, তার উত্তর পাওয়া যায়নি। সে কাহিনী এখনো রহস্যময়। তবে সেই সুড়ঙ্গ পথটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই আক্রমণের পরই ময়নাগড় ব্রিটিশের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।

তার পুত্র ব্রজানন্দের সময় ব্রিটিশের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এর ৫ শালা ১০ শালা ব্যবস্থা চালু হয়।
১৭৯১ সালে ময়না পরগনার খাজনা বাকি পড়ে। মাত্র দেড় টাকার অনাদায়ের কারণে সমান মূল্যে জমির নিলাম হবে বলে ঘোষিত হয়। কিন্তু সেটা পরবর্তীকালে কার্যকরী হয়নি। রাজা ব্রজানন্দের পর ময়না ছোট ছোট জমিদারিতে ভাগ হয়ে যায়। পূর্ণানন্দ বাহুবলীন্দ্রের আমলে (১৮৬৩ ১৯৩৭) সারা ভারত জুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। রাজা পূর্ণানন্দ এই অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। তিনি ময়না সেবক সম্মিলনী গঠিত করেছিলেন। রাজা পূর্ণানন্দ, তাদের বংশের ষোড়শ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত লোকেশ্বর শিব মন্দির এর উপরে ১৯০৫ সালে বন্দে মাতরম কথাটি খোদাই করে লিখে রেখেছিলেন। যা আজও দেখা যায়। এটি তার দেশপ্রেমের একটি নমুনা মাত্র একটি ইংরেজি ইস্কুলও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীকালে যার নাম হয় পূর্ণানন্দ বিদ্যাপীঠ। রাজা হেরেম্বানন্দের সময় সমস্ত শরীকদের মধ্যে সব সম্পত্তি ভাগাভাগি হয়ে যায়।
এই বাহুবলিন্দ্র রাজাদের আমলে এই ময়নাগড়ে দুটি মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একটি পঞ্চরত্ন শ্রী শ্রী শ্যামসুন্দর জিউর মন্দির( পঞ্চদশ শতাব্দী ) আরেকটি লোকেশ্বর শিব মন্দির ( ১৬শ শতাব্দী ,)।
যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। এবার বলব লোকেশ্বর শিব মন্দিরের কিছু কথা। এই লোকেশ্বর শিব মন্দিরের মধ্যে রয়েছে পনের ফুট গভীরে এক শিবলিঙ্গ । যা স্বয়ম্ভু । যা দেখতে অনেকটা সরু কূপের মতন। শিবলিঙ্গ দৃশ্যমান নয়। শোনা যায় কংসাবতী নদীর জল বাড়লে এই কূপটি জলে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। এই শিব মন্দির রয়েছে শ্রী রঙ্কিনী দেবী মূর্তি। এই রঙ্কিনী দেবী আসলে বৌদ্ধ মূর্তি। যা কয়েক শতাব্দী ধরে ময়নাগড়ের লোকেশ্বর শিব মন্দিরে পূজিত হয়ে আসছে । কথিত আছে, লাউ সেন এই রঙ্কিনি দেবীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই রামেশ্বর শিব মন্দিরের কিছু টেরাকোটার কাজ রয়েছে।
কালিদহের উত্তরে যেমন দরগা রয়েছে, তেমনি গড়ের পূর্ব দিকে বৈষ্ণব মোহান্ত নয়নানন্দের সংহতি দেখতে পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে বলতে গেলে ময়নাগড় হিন্দু, মুসলিম, ও বৌদ্ধ ধর্মের এক মহামিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে ময়নাগড়ে যে প্রাচীন রাজবাড়িটি দেখা যায়, সেটি গোবর্ধনানন্দের প্রতিষ্ঠিত। সেটি বাইরে থেকে একতলা দেখতে লাগলেও, অন্দরমহলের ভেতরে ঢুকে চারটি সিঁড়ি উঠলেই পৌঁছে যাওয়া যায় রাজপ্রাসাদের দ্বিতল স্থাপত্যে। এক অদ্ভুত স্থাপত্য কলা। মনে হতে পারে মাটি খুঁড়ে এই দোতলা প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছে। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। এটা একটা অদ্ভুত নির্মাণ কৌশল। কারণ দোতলা থেকে একতলায় আসতে গেলে প্রায় 18 টা সিঁড়ি ভেঙ্গে নামতে হবে। মাঝখানে চৌকা উঠোন কে রেখে চারিদিকে এই দ্বিতল প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়েছে। লম্বা টানা বারান্দায় সারি সারি থাম। আগে উপর নিচে সারি সারি অনেকগুলো ঘর ছিল। এখন এর অনেকটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাতে একতলা ও দোতলায় কয়েকটা ঘর দেখা যায়। দোতলার ঘর গুলো তালা বন্ধ । একতলার ঘর গুলো অন্ধকার। কেমন যেন গোপন কুঠরি বলে মনে হয় । নোনা ধরা দেয়াল,অন্ধকারাচ্ছন্ন আর স্যাতসাতে ঘর , আর তার সাথে একটা পুরনো গন্ধ । দরজা গুলো ছোট ছোট আর কোন জানালাও নেই। সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত রহস্যময় ব্যাপার। ঘর গুলোর আকারও খুব ছোট ছোট। গায়ে নানা রকম কুলুঙ্গী রয়েছে। আগে হয়তো এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়ার পথ ছিল এখন সে সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বা বন্ধ হয়ে গেছে। একটি সিন্দুক আছে যা আজও খোলা যায়নি। এই রাজবাড়ীটি প্রায় পরিত্যক্ত। সামনে কয়েকধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে প্রবেশ পথ দিয়ে প্রবেশ করলে বড়সড়ো হলঘর পাওয়া যায়। যেটা ছিল দরবার কক্ষ । এই ঘরটাই এখনো মোটামুটি অক্ষত বা অটুট আছে। সামনের প্রবেশপথের থাম এবং ছাদের যে অংশটুকু দেখা যায়, তাতে উৎকল স্থাপত্য, বৌদ্ধ স্থাপত্য এবং বিদেশী স্থাপত্যের মিছিল দেখা যায়। শোনা যায় এই রাজপ্রাসাদের একটি কক্ষ প্রচুর মূল্যবান সম্পদে এবং প্রত্নসম্পদে পরিপূর্ণ। তবে সেই ঘরটিকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রাসাদে মুখেই বাঁ হাতে বা দক্ষিণ দিকে তিনটি মূর্তি রয়েছে। আরেকটি কালো পাথরে খোদাই করা রয়েছে বাহুবলীন্দ্র বংশের নানা রাজার নাম।
রাজপ্রাসাদের চারিদিকে পুরো ময়নাগড় দ্বীপ জুড়ে রয়েছে বাহুবলীন্দ্র পরিবারের বর্তমান বংশধরদের বাড়িঘর। যে যার নিজের মতন করে বাড়ি ঘর বানিয়ে নিয়েছেন।
চলে আসার সময় মনে হচ্ছিল নীল আকাশের নিচে পরিখা দিয়ে ঘেরা এ এক আশ্চর্য পৃথিবী। যেন এক অদ্ভুত মায়াবী রহস্যময় জগত । কত ইতিহাস কত কিংবদন্তি আর কত ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই ময়নাগড়। রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে অন্তঃপুর বাসীদের জীবনযাত্রা ও এক অজানা পৃথিবী। যেখানে ঢোকা যায় কিন্তু জীবদ্দশায় বেরোনো যায় না। সারাটা জীবন বন্দী হয়ে থাকতে হয় অন্তঃপুরে।
রাণী দের নিয়ে আরেকটা গল্প আছে। রাধা শ্যামানন্দর বাঈজি ছিলেন প্রীতি। এই বাঈজি নাকি অসামান্য সুন্দরী ছিলেন। রাজা বাঈজিকে নিয়ে বেশি সময় কাটাতেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে রানী অপূর্বময়ী একদিন জলসা ঘরে চলে এসেছিলেন। সবার সামনে টেনে খুলে দিয়েছিলেন বাঈজি প্রীতির নাকের নথ। রাজা তাতে ভীষন রুষ্ট হয়েছিলেন। কারণ রানিদের অন্দরমহলের বাইরে আসার কোন অনুমতি ছিল না। তারপর অন্দরমহল আর বাহিরমহলের মধ্যে যে দরজাটি ছিল সেটি তিনি চিরতরে বন্ধ করে দেন। রাজা আর কখনো রানীর মুখ দেখেননি।
১৯৭১ সালে সত্যজিৎ রায় সোনার কেল্লা শুটিং করার জন্য এই রাজবাড়ীতে এসেছিলেন। এখানে কিছু প্রতিবন্ধকতা দেখা দেওয়ায় তিনি শুটিং এখানে করেননি। এই রাজবাড়ীতে এসেই তিনি অন্দরমহলের অন্তপুরীকাদের হাতে তৈরি গয়না বড়ির সন্ধান পেয়েছিলেন। যে গয়না বড়ি তিনি ঘরে বাইরে ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন ।
২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হেরিটেজ কমিশন ওর কে হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করেন।

Leave a Reply

Discover more from LAWET

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading